মানুষের জীবনে সুখী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। প্রত্যেকেই চায় একটি সুন্দর পরিবার, শান্তিময় আবাসস্থল, ভালো প্রতিবেশী এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন।
কিন্তু অনেকেই মনে করেন, প্রচুর অর্থ-সম্পদ, বিলাসবহুল বাড়ি কিংবা উচ্চ পদমর্যাদা অর্জন করতে পারলেই জীবনে প্রকৃত সুখ আসবে। অথচ বাস্তবতা হলো, এসবের সবকিছু থাকার পরও অনেকের জীবন অশান্তিতে ভরে থাকে। আবার সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও কেউ কেউ পরম প্রশান্তিতে জীবন কাটান।
মানুষের জীবনে প্রকৃত সুখ ও দুর্ভাগ্যের কিছু বাস্তব কারণ তুলে ধরেছেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
একটি হাদিসে তিনি পুরুষের সৌভাগ্যের চারটি উপাদান এবং দুর্ভাগ্যের চারটি কারণ উল্লেখ করেছেন। সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
أَرْبَعٌ مِنَ السَّعَادَةِ: الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ، وَالْمَسْكَنُ الْوَاسِعُ، وَالْجَارُ الصَّالِحُ، وَالْمَرْكَبُ الْهَنِيءُ، وَأَرْبَعٌ مِنَ الشَّقَاوَةِ: الْجَارُ السُّوءُ، وَالْمَرْأَةُ السُّوءُ، وَالْمَسْكَنُ الضَّيِّقُ، وَالْمَرْكَبُ السُّوءُ
অর্থ : ‘চারটি বিষয় সৌভাগ্যের অন্তর্ভুক্ত—সৎ স্ত্রী, প্রশস্ত আবাসস্থল, সৎ প্রতিবেশী এবং আরামদায়ক বাহন। আর চারটি বিষয় দুর্ভাগ্যের অন্তর্ভুক্ত—অসৎ প্রতিবেশী, অসৎ স্ত্রী, সংকীর্ণ আবাসস্থল এবং খারাপ বাহন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৪০৩২; শুআবুল ঈমান, বায়হাকি, হাদিস: ৯৫৫৬)
শিক্ষা ও বিধান
১. সৎ জীবনসঙ্গী : সুখী দাম্পত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ
মানুষের জীবনে সুখ-শান্তির অন্যতম বড় উৎস হলো একজন উত্তম জীবনসঙ্গী।
যে স্ত্রী স্বামীর প্রতি আন্তরিক, দ্বিনদার, বিশ্বস্ত, দায়িত্বশীল এবং সংসারের প্রতি যত্নশীল, তিনি স্বামীর জীবনে প্রশান্তির অন্যতম কারণ হয়ে ওঠেন। তাঁর ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সুন্দর আচরণে সংসার হয়ে ওঠে শান্তিময়। বিপদের সময় তিনি সাহস জোগান, দুঃসময়ে পাশে থাকেন এবং স্বামীকে আল্লাহর আনুগত্যের পথে সহযোগিতা করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً
অর্থ : ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।
’ (সুরা : রুম, আয়াত : ২১)।
একজন সৎ স্ত্রী শুধু সংসারের দায়িত্ব পালন করেন না; বরং তিনি স্বামীর দ্বিন ও আখিরাতের কল্যাণেও সহযোগিতা করেন। তাঁর উপস্থিতি স্বামীর জন্য মানসিক প্রশান্তি ও আল্লাহর আনুগত্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়া হলো ভোগের সামগ্রী। আর দুনিয়ার সর্বোত্তম ভোগের সামগ্রী হলো নেককার স্ত্রী।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৭)।
২. প্রশস্ত ও শান্তিময় আবাসস্থল : প্রশান্তির নিরাপদ ঠিকানা
মানুষের জীবনে বাসস্থানের গুরুত্ব অপরিসীম। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে মানুষ ফিরে যেতে চায় এমন একটি জায়গায়, যেখানে থাকবে নিরাপত্তা, স্বস্তি ও প্রশান্তি। একটি প্রশস্ত, পরিচ্ছন্ন ও বসবাসের উপযোগী ঘর মানুষের জীবনকে অনেকটাই সহজ করে দেয়। সেখানে পরিবারের সদস্যরা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারেন, ইবাদত করতে পারেন এবং সুন্দরভাবে সময় কাটাতে পারেন।
হাদিসে প্রশস্ত বাড়িকে সৌভাগ্যের অন্যতম উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, শুধু বড় বাড়ি হলেই মানুষ সুখী হবে; বরং এমন আবাসস্থল সৌভাগ্যের কারণ, যেখানে পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত জায়গা, নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمْ مِنْ بُيُوتِكُمْ سَكَنًا
অর্থ : ‘আর আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলোকে তোমাদের জন্য শান্তি ও আবাসস্থল বানিয়েছেন।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৮০)।
অতএব, ঘর শুধু ইট-পাথরের তৈরি কোনো স্থাপনা নয়; বরং এটি মানুষের প্রশান্তি, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার আশ্রয়স্থল। যে ঘরে দ্বিনি পরিবেশ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা রয়েছে, ছোট হলেও সেই ঘর অনেক বড় নিয়ামত।
৩. সৎ প্রতিবেশী : সামাজিক জীবনের অমূল্য নিয়ামত
মানুষ সামাজিক জীব। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের বাইরে প্রতিবেশীর সঙ্গেই মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপনের সবচেয়ে বেশি সম্পর্ক তৈরি হয়। একজন ভালো প্রতিবেশী বিপদে পাশে দাঁড়ান, অসুস্থতায় খোঁজখবর নেন, সুখে-দুঃখে সহযোগিতা করেন এবং নিজের আচরণে অন্যের জন্য নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করেন।
অন্যদিকে অসৎ প্রতিবেশী মানুষের জীবনে অশান্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারেন। তাঁর ঝগড়াটে আচরণ, অন্যের অধিকার নষ্ট করা, পরচর্চা কিংবা অহেতুক বিরক্তি পুরো পরিবারকে মানসিক অশান্তিতে ফেলতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ
অর্থ : ‘নিকট প্রতিবেশী ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৬)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يُؤْذِ جَارَهُ
অর্থ : ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)।
সুতরাং একজন ভালো প্রতিবেশী পাওয়া যেমন সৌভাগ্যের বিষয়, তেমনি নিজেও একজন ভালো প্রতিবেশী হওয়া প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখা, তার বিপদে সহযোগিতা করা এবং নিজের দ্বারা তাকে কোনো ধরনের কষ্ট না দেওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
৪. আরামদায়ক বাহন : জীবনযাত্রাকে সহজ করার নিয়ামত
যাতায়াতের সুবিধা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অনেক সহজ করে দেয়। কর্মস্থলে যাওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা, পরিবারের প্রয়োজন মেটানো কিংবা জরুরি সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানো—প্রতিটি ক্ষেত্রেই উপযুক্ত বাহনের গুরুত্ব রয়েছে। হাদিসে আরামদায়ক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় বাহনকে সৌভাগ্যের অন্যতম উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাচীন আরব সমাজে বাহন বলতে মূলত উট, ঘোড়া কিংবা অন্যান্য সওয়ারিকে বোঝানো হতো। বর্তমান সময়ে এর মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ প্রয়োজনীয় যাতায়াতের মাধ্যমও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে এখানে বাহনের দাম বা বিলাসিতা মুখ্য নয়; বরং তা যেন মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হয় এবং অযথা ভোগান্তির কারণ না হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَتَحْمِلُ أَثْقَالَكُمْ إِلَىٰ بَلَدٍ لَمْ تَكُونُوا بَالِغِيهِ إِلَّا بِشِقِّ الْأَنْفُسِ
অর্থ : ‘তোমরা এমন সব বোঝা বহন করো, যা তোমরা প্রাণান্তকর কষ্ট ছাড়া অন্য কোথাও পৌঁছাতে সক্ষম হতে না।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৭)
এ আয়াত আল্লাহর দেওয়া বাহন ও পরিবহন-সুবিধার নিয়ামতের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও উপযোগী বাহন পাওয়া আল্লাহর একটি নিয়ামত। এর জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুখী, সুন্দর ও প্রশান্তিময় জীবন দান করুন। আমিন।



















