কখনো কোনো ছোট ছোট গুনাহ বিভিন্ন কারণে বড় গুনাহে পরিণত হতে পারে। এমন কারণ ছয়টি।
যেমন—১. গুনাহের ওপর অবিচল থাকা এবং বারবার তা করতে থাকা
উদাহরণ : কোনো ব্যক্তি নারীদের দিকে তাকায়। চোখেরও ব্যভিচার আছে, আর চোখের ব্যভিচার হলো হারাম দৃষ্টিতে তাকানো। তবে চোখের ব্যভিচার প্রকৃত ব্যভিচারের তুলনায় ছোট গুনাহ। কিন্তু কেউ যদি বারবার এই গুনাহ করতে থাকে এবং এর ওপর অবিচল থাকে, তাহলে তা বড় গুনাহে পরিণত হয়। কারণ সে দৃষ্টি অবনত না করার ব্যাপারে অনড় এবং হারাম জিনিসের দিকে বারবার তাকিয়ে যাওয়ার অভ্যাস বজায় রাখে।
অতএব, গুনাহের ওপর অবিচল থাকার বিষয়টি অত্যন্ত বিপজ্জনক।২. গুনাহকে তুচ্ছ মনে করা
উদাহরণ : আপনি কোনো ধূমপায়ীকে বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় করুন। ধূমপান হারাম। আপনার বয়সও অনেক হয়েছে।’ অর্থাৎ তার মধ্যে এমন কয়েকটি বিষয় আছে, যেগুলো তাকে ধূমপান থেকে বিরত রাখতে পারে। প্রথমত, তার মাথায় চুল পেকে গেছে। দ্বিতীয়ত, তার দাড়ি রয়েছে। তৃতীয়ত, সে দরিদ্র।
এসব বিষয় তার জন্য উপদেশ গ্রহণ ও গুনাহ থেকে বিরত থাকার কারণ হওয়া উচিত।
কিন্তু সে বলল, ‘এটা তো ছোটখাটো গুনাহ!’ এখানে তার ভুল হলো সে গুনাহকে তুচ্ছ মনে করছে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তি তার গুনাহগুলোকে এত ভারী মনে করে, যেন সে একটা পর্বতের নিচে উপবিষ্ট আছে, আর সে আশঙ্কা করছে যে হয়তো পর্বতটা তার ওপর ধসে পড়বে। আর পাপিষ্ঠ ব্যক্তি তার গুনাহগুলোকে মাছির মতো মনে করে, যা তার নাকের ওপর দিয়ে চলে যায়।’
(বুখারি, হাদিস : ৬৩০৮)
হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ছোট ছোট গুনাহ থেকে বেঁচে থেকো। কেননা তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ওই সম্প্রদায়ের মতো, যারা কোনো উপত্যকায় অবতরণ করেছে। অতঃপর প্রত্যেকে একটি করে কাঠ নিয়ে এসেছে। এমনকি তা স্তূপাকার ধারণ করেছে। যার দ্বারা তারা রুটি পাকাতে পারে। আর নিশ্চয়ই ছোট ছোট গুনাহ যখন পাপীকে পাকড়াও করবে তখন তাকে ধ্বংস করে ছাড়বে।’
(মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ২২৮৬০)
৩. গুনাহ করে আনন্দিত হওয়া
আপনি দেখবেন, কেউ কেউ গুনাহ করার পর তাতে আনন্দিত হয় কিংবা আনন্দিত হওয়ার ভান করে। অথচ গুনাহ করে আনন্দিত হওয়াটা সেই গুনাহের চেয়েও গুরুতর হতে পারে। আপনি তাকে তার খারাপ কাজ নিয়ে আনন্দিত হতে দেখবেন। সে কিভাবে একজনকে গালি দিল, কিভাবে আরেকজনের রক্ত ঝরাল—এসব নিয়ে গর্ব করে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি এবং তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি কাজ।’
(নাসাঈ, হাদিস : ৪১২৩)
অথবা কেউ কোনো সম্ভ্রান্ত ও পবিত্র নারীকে বিপথগামী করতে পেরে আনন্দিত হয়। সে কিভাবে তার সম্মানহানি করতে পেরেছে, তা নিয়ে গর্ব করে। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’
(সুরা : আন-নূর, আয়াত : ১৯)
কাজেই সতর্ক হোন! গুনাহ করে আনন্দিত হওয়া গুনাহের চেয়েও গুরুতর হতে পারে।
৪. আল্লাহ যে গুনাহ গোপন রেখেছেন, সেটিকে অবহেলা করা
গুনাহ করার পর এর সঙ্গে যেসব বিষয় যুক্ত হয়, সেগুলো অনেক সময় মূল গুনাহের চেয়েও গুরুতর হয়ে ওঠে। গুনাহ করার সময় তোমার ডানে ও বাঁয়ে যাঁরা আছেন, তাঁদের প্রতি লজ্জাবোধ না করা—এটি গুনাহের চেয়েও গুরুতর। আল্লাহ তোমার সঙ্গে কী আচরণ করবেন, তা না জেনেও হাসিখুশি থাকা—এটিও গুনাহের চেয়েও গুরুতর। গুনাহ করার সুযোগ হাতছাড়া হলে তার জন্য দুঃখিত হওয়া—এটিও গুনাহের চেয়েও গুরুতর। আল্লাহ বলেন, ‘আর জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের অন্তরের খবর রাখেন। অতএব, তাঁকে ভয় করো।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৩৫)
৫. প্রকাশ্যে গুনাহ করা এবং তা প্রচার করা
কোনো ব্যক্তি রাতে গুনাহ করল এবং আল্লাহ তার গুনাহ গোপন রাখলেন। কিন্তু পরদিন সে অন্যদের কাছে নিজের গুনাহের কথা বলতে শুরু করল। এভাবে সে নিজেই আল্লাহর দেওয়া গোপনীয়তার আবরণ ছিন্ন করল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের সবাইকে ক্ষমা করা হতে পারে, প্রকাশ্যে গুনাহকারীরা ছাড়া।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৬৯)
এরপর তিনি ব্যাখ্যা করেন, কোনো ব্যক্তি রাতে একটি গুনাহ করল, আর আল্লাহ তা গোপন রাখলেন। কিন্তু সকালে সে অন্যকে বলে বেড়ায়, হে অমুক! গত রাতে আমি এই এই কাজ করেছি।
অর্থাৎ রাতে তার রব তাকে আড়াল করেছিলেন, কিন্তু সকালে সে নিজেই আল্লাহর দেওয়া আড়াল সরিয়ে দিল।
তাই নিজের গুনাহ নিয়ে গর্ব করা, তা প্রচার করা এবং অন্যদের সামনে প্রকাশ্যে তা করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
৬. অনুকরণীয় ব্যক্তির ছোট ছোট পাপ বড় পাপে রূপ নেয়
এমন একজন ব্যক্তির কথা চিন্তা করুন, যিনি কোনো কারখানার পরিচালক, বিদ্যালয়ের প্রধান, কলেজের শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, মাদরাসার শিক্ষক বা একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তিনি ধূমপান শুরু করলেন। তখন তাঁর দলের অন্যরাও তাঁকে দেখে ধূমপান শুরু করল। এরপর তিনি মাদক সেবন শুরু করলেন। অন্যরাও তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে লাগল। পরে বিষয়টি অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল এবং একটি সাধারণ প্রবণতায় পরিণত হলো। এভাবেই ঘটে যখন আপনি এমন কেউ হন, যাঁকে অন্যরা অনুসরণ করে। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিসটি প্রযোজ্য : ‘যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো মন্দ প্রথার প্রচলন করে, তার ওপর সেই কাজের পাপ বর্তাবে এবং তার পরে যারা সে অনুযায়ী আমল করবে, তাদের পাপের সমপরিমাণ পাপও তার ওপর বর্তাবে; অথচ তাদের পাপের পরিমাণ থেকে কিছুই কমানো হবে না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২০৩; তিরমিজি, হাদিস : ২৬৭৫)
সূত্র-কালেরকণ্ঠ


















