Advertisement

হিজরতের পথে আসমা (রা.)-এর অসীম সাহস ও আত্মত্যাগ

  • অনলাইন ডেস্ক অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১২:০১:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
হিজরতের পথে আসমা (রা.)-এর অসীম সাহস ও আত্মত্যাগ
ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছিল মক্কার মুশরিকরা। ইসলাম গ্রহণের কারণে অনেক সাহাবিকে সহ্য করতে হয়েছে অমানবিক অত্যাচার। কাউকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়েছে, কাউকে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে, আবার কাউকে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু এত নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও মুসলমানদের ঈমানের দৃঢ়তা বিন্দুমাত্র কমেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। মক্কার মুশরিক নেতারা বুঝতে পারছিলেন, ইসলামের দাওয়াত যত বিস্তৃত হচ্ছে, তাঁদের প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব ততই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তাই তাঁরা মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। এমন পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে মুসলমানরা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে মদিনায় হিজরত করতে শুরু করেন। এর আগে মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্রের একদল মানুষ আকাবার দ্বিতীয় অঙ্গীকারে মহানবী (সা.)-কে সাহায্য ও নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ফলে মদিনায় ইসলামের একটি নিরাপদ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু হিজরত শুধু এক শহর থেকে অন্য শহরে চলে যাওয়ার নাম ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ঈমান, ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। মুসলমানদের অনেকেই নিজেদের বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সহায়-সম্পদ পেছনে ফেলে অজানা পথে যাত্রা করেছিলেন। তাঁদের সামনে ছিল শত্রুর বাধা, পথে লুণ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা এবং প্রাণ হারানোর ঝুঁকি। এদিকে মক্কার নেতারাও বুঝতে পারছিলেন, মুসলমানরা যদি মদিনায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পান, তাহলে ইসলামের দাওয়াতকে আর সহজে থামানো যাবে না। তাই তাঁরা মহানবী (সা.)-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। আর এই সংকটময় অধ্যায়ে ইতিহাসের মঞ্চে আবির্ভূত হন এক সাহসী নারী—হজরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)।হিজরতের আগের রাত 

মক্কার মুসলমানদের অধিকাংশই যখন মদিনার উদ্দেশে যাত্রা করেছেন, তখন মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে মক্কায় রয়ে গিয়েছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সাহাবি আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং আরো কয়েকজন মুসলমান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হজরত আলী (রা.)। তিনি মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে মানুষের আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করার জন্য মক্কায় অবস্থান করেছিলেন। অন্যদিকে, মুশরিক নেতারা মহানবী (সা.)-কে হত্যা করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। বিভিন্ন গোত্রের নির্বাচিত যুবকদের একত্র করে তাঁরা এমনভাবে হত্যাকাণ্ডটি ঘটাতে চেয়েছিলেন, যাতে কোনো একটি গোত্রকে এককভাবে দায়ী করা না যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসুলকে এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত করেন। মহানবী (সা.)-কে মক্কা ত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া হয়।

তিনি গোপনে হজরত আবু বকর (রা.)-এর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে হিজরতের অনুমতির কথা জানান। আবু বকর (রা.) আগে থেকেই এই সৌভাগ্যজনক সফরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গী হওয়ার প্রত্যাশায় অপেক্ষা করছিলেন। এ জন্য তিনি দুটি উটও প্রস্তুত রেখেছিলেন। মহানবী (সা.)-এর সফরসঙ্গী হওয়ার সংবাদ শুনে তাঁর আনন্দের সীমা রইল না। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সফরে প্রিয় নবীজির পাশে থাকার সুযোগ তাঁর কাছে ছিল পরম সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু এই যাত্রার প্রস্তুতি কেবল দুজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল আবু বকর (রা.)-এর পরিবারও। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছিলেন তাঁর কন্যা আসমা (রা.)।

বিপদের মুখে দায়িত্ব পালনে অবিচল এক তরুণী

হজরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) ছিলেন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর কন্যা এবং হজরত আয়েশা (রা.)-এর বড় বোন। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী, সাহসী ও দৃঢ়চেতা একজন নারী। মহানবী (সা.) ও তাঁর বাবা যখন মক্কা ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন আসমা (রা.)-এর সামনে এসে দাঁড়ায় এক কঠিন দায়িত্ব। তাঁকে এমন একটি অভিযানে সহযোগিতা করতে হচ্ছিল, যার সামান্য তথ্যও শত্রুদের হাতে পৌঁছে গেলে পুরো পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারত।

একদিকে প্রিয় নবীজি (সা.)-এর নিরাপত্তা, অন্যদিকে নিজের পরিবারের ভবিষ্যৎ—সবকিছুই তখন অনিশ্চয়তার মধ্যে। মক্কার মুশরিকরা যদি জানতে পারে যে আবু বকর (রা.) মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে হিজরত করেছেন, তাহলে তাঁর পরিবারের ওপরও নির্যাতন নেমে আসতে পারে। কিন্তু আসমা (রা.) ভয় পেয়ে দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাননি। বরং বিচক্ষণতা ও সাহসের সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করতে এগিয়ে এসেছিলেন।

মহানবী (সা.) ও হজরত আবু বকর (রা.)-এর যাত্রার জন্য খাবার ও পানীয় প্রস্তুত করা প্রয়োজন ছিল। আসমা (রা.) দ্রুত প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয় সংগ্রহ করে চামড়ার থলেতে ভরে ফেললেন। কিন্তু থলেগুলো উটের সঙ্গে বাঁধতে গিয়ে দেখা গেল, সেগুলো বাঁধার মতো কোনো দড়ি বা ফিতা হাতের কাছে নেই। এমন সংকটময় মুহূর্তে আসমা (রা.) এক অভিনব সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি নিজের কোমরবন্ধ খুলে ফেললেন এবং সেটি দুই টুকরা করে খাবার ও পানীয়ের থলে বাঁধার কাজে ব্যবহার করলেন। মহানবী (সা.) তাঁর এই আত্মত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে দোয়া করলেন, আল্লাহ যেন এর বিনিময়ে তাঁকে জান্নাতে দুটি কোমরবন্ধ দান করেন। এ ঘটনার পর আসমা (রা.)-এর উপাধি হয়ে যায় ‘যাতুন নিতাকাইন’—অর্থাৎ ‘দুই কোমরবন্ধের অধিকারিণী’।

ইতিহাসে অনেক বড় বড় বিজয়ের কথা লেখা হয়। কিন্তু কখনো কখনো একটি ছোট কাজও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অমর হয়ে থাকে। আসমা (রা.)-এর কোমরবন্ধ ছিঁড়ে থলে বাঁধার ঘটনাটি তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিরাপত্তা ও হিজরতের প্রস্তুতিতে তাঁর এই সামান্য উপকরণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

হিজরতের এই সফরে হজরত আবু বকর (রা.) নিজের সব অর্থ-সম্পদ সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মহানবী (সা.)-এর সফরে যেন কোনো ধরনের আর্থিক অসুবিধা না হয়, সে বিষয়ে তিনি বিশেষভাবে সতর্ক ছিলেন। কিন্তু তাঁর এই সিদ্ধান্ত পরিবারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারত। কারণ, তিনি চলে গেলে ঘরে থেকে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন কীভাবে পূরণ হবে, সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই দেখা দিয়েছিল। আসমা (রা.)-এর দাদা আবু কুহাফা তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন দৃষ্টিশক্তিহীন বৃদ্ধ। ছেলের দেশত্যাগের সংবাদ শুনে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে আসমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আবু বকর কি তাঁর পরিবারকে অসহায় অবস্থায় রেখে গেছেন? তিনি কি তাঁদের জন্য কোনো সম্পদ রেখে যাননি?

বৃদ্ধ দাদার এই প্রশ্নে আসমা (রা.) বুঝতে পারলেন, তিনি যদি বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ না থাকার কথা সরাসরি জানান, তাহলে দাদা আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বেন। তাই তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেন। কিছু নুড়িপাথর একত্র করে কাপড় দিয়ে ঢেকে একটি পাত্রে রাখলেন। এরপর দাদার হাত সেই পাত্রের ওপর স্পর্শ করিয়ে বললেন, তাঁর বাবা পরিবারের জন্য যথেষ্ট সম্পদ রেখে গেছেন। এভাবে তিনি বৃদ্ধ দাদাকে আশ্বস্ত করলেন, যাতে তিনি মনে করেন, পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।

আবু জাহেলের সামনে আসমা (রা.)-এর অসীম সাহস

মহানবী (সা.)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মক্কার মুশরিকরা রাতভর তাঁর বাড়ির আশপাশে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের চোখ এড়িয়ে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন। সকালে ষড়যন্ত্রকারীরা যখন বুঝতে পারল যে তাঁদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে, তখন ক্ষোভে ফেটে পড়ল তারা। মহানবী (সা.)-কে না পেয়ে তারা হজরত আবু বকর (রা.)-এর বাড়ির দিকে ছুটে গেল। সেখানে উপস্থিত হলো মক্কার অন্যতম নিষ্ঠুর নেতা আবু জাহেল। সে আবু বকর (রা.)-এর সন্ধান জানতে চাইল। কিন্তু আসমা (রা.) তাঁর বাবার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করলেন না।

মহানবী (সা.) ও হজরত আবু বকর (রা.) মদিনার সরাসরি পথ ধরে যাত্রা শুরু না করে মক্কার দক্ষিণে অবস্থিত সাওর গুহায় আশ্রয় নেন। তাঁদের অবস্থান গোপন রাখার জন্য সেখানে কয়েক দিন অপেক্ষা করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পবিত্র কোরআনে এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন তিনি তাঁর সঙ্গীকে বলেছিলেন, “দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৪০)

এদিকে তাঁদের খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছিলেন আসমা (রা.)। বিপজ্জনক পরিস্থিতি সত্ত্বেও তিনি গোপনে সাওর গুহায় গিয়ে তাঁদের জন্য খাবার ও পাথেয় পৌঁছে দিতেন। আসমা (রা.)-এর পাশাপাশি তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা.)-ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি মক্কার লোকজনের কথাবার্তা ও পরিকল্পনার খবর সংগ্রহ করে রাতে গুহায় গিয়ে তাঁদের জানাতেন। আবু বকর (রা.)-এর মুক্তদাস আমির ইবনে ফুহাইরা (রা.)-ও তাঁর পশুপাল নিয়ে চলাচল করে পদচিহ্ন মুছে দিতে সহায়তা করতেন। এভাবে একটি সুপরিকল্পিত ব্যবস্থার মাধ্যমে মহানবী (সা.)-এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

বাবার কোমরবন্ধ ছিঁড়ে খাবারের থলে বাঁধা, বৃদ্ধ দাদাকে সান্ত্বনা দেওয়া, আবু জাহেলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সত্য গোপন রাখা—ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)-এর সাহসিকতা। এভাবে মহানবী (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের কঠিন সময়ে তাঁর বুদ্ধিমত্তা, আত্মত্যাগ ও আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সূত্র-কালেরকণ্ঠ

জনপ্রিয়